রোদ চশমা পড়া মেয়েটা

ট্রেনের ভেতরে কেউ রোদ চশমা পড়ে থাকলে তার সমন্ধে কি ভাবা যায়?
ভাব বেশি নয়ত তার চোখে কোন সমস্যা আছে?
আমার দুই সিট সামনে বসে থাকা মেয়েটার সমস্যা প্রথম টা।একটু ভাব বেশি।
বাহিরে না হয় রোদ, সেখানে রোদ চশমা মানায় কিন্তু ট্রেনের ভিতর কেন পড়তে হবে?
আপনার একটা দামী চশমা আছে সেটা দেখানোর জন্য?
.
গোটা বগিতে বেশির ভাগ ছেলের চোখ সেই মেয়েটার দিকে, সেই সাথে আমার চোখ দুটোও। মেয়েটার চশমা ছাড়াই যেটুকু দেখা যাচ্ছে তাতেই আন্দাজ করা যাচ্ছে মেয়েটা বেশ সুন্দরী।
.
মেয়েটা কেন রোদ চশমা পড়ে আছে বোঝা যাচ্ছেনা। মেয়েটার চোখে কোন সমস্যা নেই তা এক প্রকার শিউর। আবার মেয়েটার চোখ যে অসুন্দর তাও না। যখন মেয়েটা ট্রেনে উঠছিলো তখন দেখেছি মেয়েটার চোখ। আমার কাছে বেশ লেগেছে। তাহলে শুধু শুধু কেন রোদ চশমা?
.
ইচ্ছা হচ্ছে গিয়ে বলে ফেলি,
-“এত সুন্দর চোখ জোড়া ঢেকে রেখেছেন কেন?
এটা তো গুরুতর অপরাধ। ”
এক প্রকার বাধ্য হয়েই এই ইচ্ছাটা নিবারণ করতে হচ্ছে।মেয়েটা অবশ্য ট্রেনে একা উঠেছে সুযোগ পেলেই কথাটা বলা যায় কিন্তু মন সায় দিলো না। এটা বললে তা এক ধরণের বেয়াদবী হয়ে যাবে।
.
আমার চোখের সামনে হুমায়ূন আহমেদের একটা বই আছে, সেটার দু এক পাতা পড়ছি আর মেয়েটার দিকে তাকাচ্ছি। মেয়েটা চোখে চশমা থাকার কারণে মেয়েটা কোন দিকে তাকাচ্ছে বোঝা যাচ্ছেনা, তবে শিউর বুঝে ফেলেছে যে আমি তার দিকেই তাকাচ্ছি।
প্রায় ঘন্টা তিনেক এভাবেই কেঁটে গেলো, মেয়েটা একবারো চশমা খানা খুললো না। আমার মেয়েটার সুন্দর চোখ জোড়া কোন ভাবেই দ্বিতীয় বার দেখা হলোনা। এক প্রকার আফসোস হল যখন দেখলাম এভাবেই এক সময় আমার স্টেশন এসে গেছে।
তখনি একটা রিস্ক নিয়ে নিলাম,নামার প্রস্তুতি নিয়ে মেয়েটার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলেই ফেললাম,
-চোখ জোড়া ঢেকে রেখেছেন কেন?
এটা ঠিক না,মোটেও ঠিক না।
.
মেয়েটা আমার কথা শুনে নড়ে চড়ে উঠল।
আমি ভেবেছিলাম মেয়েটা চশমা খুলে তাকাবে কিন্তু এমন হলো না। মেয়েটা শুধু বলে উঠল,
-এক্সকিউজ মি,
.
আমি আর দেরী করলাম না,খুব দ্রুত ট্রেন থেকে নেমে হাঁটা দিলাম। এক বারো পিছনে ফিরে তাকালাম না।
মেয়েটার রাগে কটমট করা চেহারা টা দেখার কোন ইচ্ছাই রইল না।তবে সুন্দর চোখগুলো দ্বিতীয় বার না দেখতে পাওয়ার জন্য আফসোস ঠিকই রয়ে গেল।
.
.
দুই
.
সকালে কারো ফোন পেলে বিরক্ত লাগে, বিশেষ করে ঘুমে থাকলে। আজও ব্যাতিক্রম হলোনা।
ঘুমের বারোটা বাজিয়ে ফোন টা বেজে উঠলো। হাতে নিয়ে দেখি রঙ নাম্বার। উলটা পালটা কিছু বলবো এই চিন্তা করে ফোন টা ধরলাম,অন্য সময় অপিরিচিত নাম্বার থেকে আসা কল টল ধরিনা বললেই চলে। ফোন ধরেই বললাম,
-কে?
.
ওপাশ থেকে এক মেয়ে কন্ঠ বলে উঠল,
-কে? এভাবে ফোনে কেউ কথা বলে। হ্যালো না বলেই কে?
-সর‍্যি,কে আপনি?
-আমি কে তা দিয়ে আপনার কোন লাভ নাই।
আপনার একটা জিনিষ আমার কাছে আছে,
-কি?
-একটা বই,ট্রেনে ফেলে গিয়েছিলেন।
-হ্যাঁ, মনে পড়েছে।
-বই টা আমি পেয়েছি।বইয়ে একটা ফোন নাম্বার ছিল সেটা দেখেই কল দিলাম।
-ধন্যবাদ,, আমার সব বইয়েই আমি ফোন নাম্বার লিখে রাখি। বই ফেলে যাওয়ার অভ্যাস আছে তো হালকা,
-তো কিভাবে নিবেন?
-আপনি যখন ফ্রি থাকবেন আমাকে জানাবেন, আমি গিয়ে বইটা নিয়ে আসবো।
-আচ্ছা ঠিকাছে
-অনেক ধন্যবাদ,
.
বইটার কথা ভুলেই গেছিলাম। পেয়ে ভালই হলো। শেষ কয়েক পৃষ্টা পড়া হয়নি পড়া হয়ে যাবে।
.
বিকাল বেলা আবার ওই নম্বর থেকে ফোন এলো। আমি বই নেয়ার জন্য মেয়েটার দেয়া ঠিকানা মত চলে গেলাম।যেটা একটা রেস্টুরেন্ট এর ঠিকানা।
.
রেস্টুরেন্টে ঢুকে ধাক্কার মতই খেলাম।
ট্রেনের রোদ চশমা পড়া মেয়েটা। এই মেয়েটাই যে আমার বই পেয়েছে সেটা বুঝতে বাকী রইল না। কিন্তু এই মেয়েটা এখানেও রোদ চশমা পড়ে আছে কেন?
মেয়েটার চোখে সত্যি কোন সমস্যা আছে?
.
মেয়েটার সামনে যেতেই মেয়েটা বলল,
-নয়ন সাহেব এসেছেন তাহলে?
-আপনি আমার নাম ও জানেন,
-বইয়ে ফোন নাম্বারের সাথে নাম ও লেখা আছে আপনার.
-সেদিনের জন্য সর‍্যি,
-কোন দিনের জন্য?
-ওই যে ট্রেনে,
-স্বীকার করছেন যে ওটা বেয়াদবী ছিল?
-হুম,
-আচ্ছা, মাফ করলাম।
-থ্যাংক্স, কি খাবেন,
-চা,
.
আমি চায়ের অর্ডার দিয়ে বললাম,
-বইটার জন্য থ্যাংক্স,, আর আপনার নাম টাই তো জানা হলোনা,
-আমি মীরা,
-বেশ ভাল নাম। মীরার গ্রামের বাড়ি নামে একটা বই আছে পড়েছেন?
-জ্বী না,,
.
ততক্ষনে চা এসে গেছে। চায়ে চুমুক দিয়ে আমি আবার বললাম,
-একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?
.
মীরা আমার কথা শুনে হাসলো।মীরা বলল,
-আমি জানি কি বলবেন!
-কি?
.
মীরা কোন জবাব দিল না।
ও নিজের চশমা খুলে আমার দিকে তাকালো। ওর চোখের নিচে একটা কালো দাগ। এ দাগের জন্যই ও সব সময় নিজের চোখ ঢেকে রাখে। তবে আমার মনে হয়নি এ দাগের কারণে ওর সৌন্দর্য কমেছে। সামান্য একটু দাগ,দূর থেকে বোঝা যায়না।কাছে গেলেই টের পাওয়া যায়।
এজন্যই হয়ত ট্রেনে প্রথম বার ওকে দেখে টের পাইনি।
.
ও আবার চশমা টা চোখে পড়ে নিলো। তারপর বলল,
-এটাই তো জানতে চেয়েছিলেন?
আমি বললাম,
-চলুন উঠি,,
-আচ্ছা,,
.
আমার একটু মীরার জন্য মন খারাপ হলো।
এত সুন্দর একটা মেয়ে, একটু কাঁটা দাগের জন্য কত অস্বস্তি পরতে হচ্ছে ওকে।তবে আমার ওকে বেশ ভাল লেগেছে।
.
মীরা হয়ত আমাকে দেখে ব্যাপার টা বুঝল,
ও নিজেই বলল,
-মন খারাপ হলো?
-কেন?
-এই যে আমার মুখে কাঁটা দাগ,আপনি ট্রেনে আমাকে অন্য রকম কিছু ভেবেছিলেন।
.
আমি একটু হাসলাম।মেয়েটা বেশ চালাক।
আমি হাসি মুখেই বললাম,
-মন খারাপ হয়েছে তবে সেজন্য নয়,
-তাহলে কি কারণে?
-আজ বলব না,
-কবে বলবেন?
-পরের বার যেদিন দেখা হবে।
-পরের বার দেখা হবে?
-আপনি চাইলে অবশ্যই,,
.
মীরা কিছু বলল না।
ও একটা রিকশায় উঠে পড়ল।
আমি তাকিয়ে রইলাম ওর চলে যাওয়ার দিকে। ও একবার পিছন ঘুরে তাকালো।
চোখে চশমা নেই।বেশ লাগছে ওকে দেখতে।
.
বাসায় ফিরে মীরার ব্যাপার টা মাথা থেকে গেল না।
রাতে শোয়ার পর মনে হলো মীরার সাথে একবার কথা না বললে ঘুমই হবেনা।
এমন কেন হচ্ছে বোঝা গেল না।
মেয়েটার সমন্ধে আমি জানিও খুব অল্প।দেখা হয়েছে দুবার। তারমধ্য কথা হয়েছে একবার।
তবে মেয়েটার মধ্য ভাল লাগার অনেক কিছুই আছে।বিশেষ করে চোখের নিচের কালো দাগ টার জন্য হয়তবা।
.
আমি মীরাকে ফোন না দিয়ে ম্যাসেজ করলাম,
-কাল দেখা হতে পারে?
.
মিনিট খানেক বাদে মীরার ফোন।ফোন ধরতেই ও বলল,
-দেখা করতে চান কেন?
-ওই যে মন খারাপ কেন হয়েছিল সেটা বলার জন্য
-ফোনেই বলতে পারেন,
-দেখা করে বলি,
-কাল ক্লাস আছে, ক্যাম্পাসে আসতে পারবেন?
-হুমম, পারবো।।
.
ফোন রেখে কেমন যেন লাগলো।
ওর ক্যাম্পাসে কেন ডাকলো?
ওর বিএফ এর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য নয়ত?
এত দ্বিধা নিয়েও পরের দিন সময় মত পৌছে গেলাম মীরার ক্যাম্পাসে। ওকে খুঁজে পেতে বেগ পেতে হলো না। ও ওর বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিলো। এসময় ওর চোখে চশমা ছিল না।
.
মীরা আমাকে দেখতে পেয়েই এগিয়ে এলো। সামনে এসে বলল,
-তো বলেন?
-কি বলব?
-মন খারাপ কেন?
.
আমি উলটো জিজ্ঞেস করলাম,
-চশমা হাতে কেন?
-ওরা আমার পছন্দের মানুষ তাই,
-কোথাও ঘুরতে যাবেন আমার সাথে?
-কেন?
-এমনিতেই, আমার ইচ্ছা পৃথিবীর সব চাইতে সুন্দর চোখের মেয়েটার সাথে রিকশায় বসে ঘোরার,,
.
মীরা আমার কথা শুনে হেসে ফেলল। বলল,
-ফ্লাটিং করার জন্য আমাকেই বেছে নিয়েছেন?
-জ্বী না,শোনেন রিকশায় ঘোরার সময় মোটেও চোখে চশমা রাখবেন না।
-আমি মোটেও ঘোরার জন্য রাজী হইনি,
-হয়ে যান,
-চশমা কেন রাখব না?
-কারণ আপনার চোখ জোড়াই বেশি ভাল লাগে আমার,,
-আপনি আমার প্রিয় মানুষ নন?
-হতে কতক্ষন?
-এই তিন দিন দেখাতেই,
-আমি আপনাকে প্রেমের প্রস্তাব দিই নি যে তিন দেখাতে রাজী হবেন? শুধু চশমাটাই রেখে দিতে বলছি হাতে!
-তবুও?
-রিকশা ঠিক করা আছে,যাবেন?
.
মীরা কি যেন ভেবে বলল,
-আচ্ছা,চলেন।
মীরা ওর বন্ধুদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমার সাথে এলো।
.
রিকশায় উঠে মীরা চোখে চশমা দিল না।
আমি টানা ওর দিকে তাকিয়ে ছিলাম তাই দেখে ও বলল,
-কি দেখেন?
-কিছুনা,
-আমি বাসা যাবো,
-আচ্ছা, রিকশাওয়ালাকে বলে দেন,
.
মীরা রিকশাওয়ালাকে ওর বাসার কথা বলে দিয়ে আবার আমাকে জিজ্ঞেস করলো,
-মন খারাপ কেন হয়েছিল বলবেন না?
-এখন মন ভাল হয়েছে?
-কীভাবে?
-রিকশায় ঘুরে,,
.
মীরা আমার কথা শুনে আবার হাসলো।
আমি বললাম,
-মীরা কাল দেখা হবে?
-নাহ, আমি খুব একটা বের হইনা বাসা থেকে,
-আচ্ছা,,

কিছুক্ষন বাদে রিকশা মীরা দের বাসার সামনে চলে এলো, মীরা রিকশা থেকে নেমে সোজা ভেতরে চলে গেলো।
আমি রিকশা সহ কিছুক্ষন বসে রইলাম, মিনিট দুয়েক বাদে ও আবার ফিরে এলো।হাতে একটা বই, হয়ত উপন্যাস।
বইটা আমার হাতে দিয়ে মীরা বলল,
-কাল ফেরত নিবো,পড়ে আসবেন।
.
আমি মীরার দিকে তাকিয়ে হাসলাম।
মীরা দেরী করল না,খুব দ্রুত আবার ভেতরে চলে গেলো। আমি রিকশাওয়ালাকে রিকশা ঘোরাতে বললাম।বইটা দিকে চোখ দিলাম, মলাট করা বই।
বইটা খুলতেই প্রথম পৃষ্টায় চোখে পড়ল,তাতে লেখা,
“সেই ছেলেটাকে, যে আমার চোখের এত্ত গুলা প্রশংসা করেছে আর যার সাথে আমি রিকশায় করে ঘুরেছি।”
যদিও আমরা আজ ঘুরিনি পরের দিন ঘুরবো।
.
এটুকু পড়েই বেশ ভাল লাগলো।
রোদ চশমা পড়া মেয়েটাকে আমার সত্যি ভাল লাগে।
আমি মোবাইল বের করে ম্যাসেজ করলাম,
-কাল কখন ফেরত নিবেন বইটা?
.
মিনিট খানেক বাদেই আমার মোবাইলের ম্যাসেজ টোন টা বেজে উঠলো। আমি ম্যাসেজ টা পড়লাম না।
থাকুক ম্যাসেজ টা,যতখন ম্যাসেজ টা অদেখা থাকবে ততক্ষন অন্য রকম ভাল লাগা কাজ করবে মীরার প্রতি। আমি এই মেয়েটাকে ভাল লাগাতে চাই, ভাল বাসতে চাই তার চোখ দুটোকে, ওই চোখের নিচের দাগ টাকেও।
.
.
-নাহিদ পারভেজ নয়ন

Download Premium WordPress Themes Free
Free Download WordPress Themes
Download WordPress Themes Free
Download WordPress Themes
udemy course download free
download redmi firmware
Download WordPress Themes Free
download udemy paid course for free
Share:

Leave a Reply

All rights reserved by Kid Max.