নীল রঙা ছাতা

নীল রঙের কিছু দেখলেই আমার বেশ বিরক্ত লাগে,আমি বুঝিনা নীল রঙে পছন্দের কি আছে?
তবুও সবচাইতে অবাক করার বিষয়, আমাদের দেশের বেশির ভাগ ছেলে মেয়ের পছন্দই এই নীল রঙ।যে কোন গল্প/উপন্যাসে নীল রঙের ছড়াছড়ি।
.
মাঝে মাঝে এই নীল রঙের বিরক্তি টা চরম আকার ধারণ করে।যেমন এখন করেছে?
নীল রঙের একটা ছাতা হাতে নিয়ে আমি হাঁটছি। আকাশে তেমন রোদ নেই, নেই বৃষ্টিও।
তবুও ছাতাটা হাতে নিয়ে হাঁটতে হচ্ছে।
আমি এই ছাতার মালিকের বাসা খুঁজছি।
.
বিকালে বাসায় ফিরতেই মা ছাতাটা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,যার ছাতা তাকে দিয়ে আসতে। কার ছাতা জিজ্ঞেস করতেই,উনি ডিটেইলস বললেন।
.
উনি সকালে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন, বের হওয়ার পর বৃষ্টি শুরু হয়।সাথে ছাতা ছিল না।
তখনি এই ছাতার মালিক মা কে ছাতা দিয়ে সাহায্য করে।
সব ঠিকই ছিল, শুধু ছাতার রঙখানা দেখে বিরক্ত লাগল। ছাতার মালিক কম বয়সী কোন ঢঙী মেয়ে হবে সেটাও ছাতার রঙ দেখে বুঝলাম। ছাতার এক পাশে মারকার দিয়ে লেখাও আছে “মেঘলা”।
ছাতার মালিকের নাম সম্ভবত। এই মেয়ের নামেও বৃষ্টি বৃষ্টি ভাব।এর কাছে দেখা যাবে কয়েক ডজন ছাতা আছে।
কি আর করার বিরক্তি সত্ত্বেও ছাতা খানা নিয়ে বের হতে হলো।
.
মায়ের দেয়া ডিরেকশন অনুযায়ী যে বাসায় পৌছালাম, সে বাসা দেখে আর সন্দেহ রইল না এটা ওই ছাতার মালিকের বাসা।
বাড়ির রঙ ও নীল।
বাড়ি টা দেখেও বিরক্তির চরম সীমা অতিক্রম করলাম।
.
আকাশের অবস্থা আস্তে আস্তে খারাপের দিকে যাচ্ছিল তাই আর সময় নষ্ট না করে বাসার কলিংবেল বাজিয়ে দিলাম।
.
দুবার কলিংবেল বাজাতেই গেট খুলে গেল।
গেট যে মেয়েটা খুলল, সেই মেয়েটাকে দেখে আমার একটা কথাই মনে হল, “blue eyes”।
এই প্রথম কোন নীল চোখের মেয়ে দেখছি।
এই মেয়ের সাথে নীল মানায়। এই মেয়ের জন্যই মনে হয় নীল রঙের জন্ম।
আমি ভুল করে বলেই ফেললাম,
-নীলাশা,
অবশ্য আস্তে আস্তে বলেছিলাম,মেয়েটার কানে যায়নি।
.
মেয়েটা শাড়ি পড়ে আছে, নীল শাড়ি।
মনে হচ্ছে আমার সামনে এক আকাশ নিয়ে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
আমি অবাক হয়েই তাকিয়েছিলাম,আমার ঘোর কোন ভাবেই কাঁটছিল না। তাই দেখে মেয়েটা জিজ্ঞেস করল,
-কি চাই?
.
আমি ছাতাটা এগিয়ে দিয়ে বললাম,
-আপনার ছাতাটা,
-ও, অনেক ধন্যবাদ।
বেরুচ্ছিলাম দরকার ছিল।
-হুম, আপনার নাম কি?
-কেন?
-না,ছাতায় লেখা মেঘলা,
-হ্যাঁ, ওটাই।
-আপনার নাম নীলাশা হওয়া উচিত ছিল,অথবা নীলা। আচ্ছা, বাই।
.
আমি মেয়েটাকে আর কিছু বলার সু্যোগ না দিয়ে দরজা থেকে সরে গেলাম।
আমি চাইনা মেয়েটা বুঝে ফেলুক আমি তার প্রেমে পড়ে গেছি। লাভ এট ফাস্ট সাইট যাকে বলে। আমার দূর্বলতা কাওকে জানাতে চাইনা।
.
দরজার থেকে সরে এসে রাস্তায় নামতে পারলাম না ততক্ষনে বেশ জোরে সোরে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে।
কিছুক্ষন বাদে মেঘলাও এলো, আমার দিকে একবার তাকিয়ে ছাতা হাতে নিয়ে রাস্তায় নেমে গেল। কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে আবার পিছন ফিরে তাকালো।
.
আমি খুব করে চাইছিলাম মেয়েটা ডাকুক। বলুক, কিছুদূর এগিয়ে দিচ্ছি,আসুন।
আমি এসব ভাবতে ভাবতে মেয়েটা মানে মেঘলা ডাক দিলো,
-আপনি আসবেন সাথে?
আমার বান্ধবী সামনের মোড় এ আছে, মোড় পর্যন্ত আসুন তারপর…..
.
আমি এত কিছু বলার সময় না দিয়ে দ্রুত মেঘলার ছাতার নিচে চলে গেলাম। মেঘলাও বেশ লম্বা, তাই ছাতাটা আমাকে নিতে হল না।
ও নিজেই ছাতাটা উঁচু করে ধরে হাতে রাখলো।
.
আমাদের গায়ের সাথে গা লেগে যাচ্ছিল।
আমি অবশ্য সামলে নিলাম,, মেয়েটা পরে কি ভাববে কে জানে?
তবে মেঘলার গায়ের সুগন্ধ পাচ্ছিলাম বেশ।
আমার পারফিউম বেশ দামী ছিল,সেটা ছাপিয়ে পরিবেশ মেঘলা মেঘলা হয়ে গিয়েছিল।
আমি চোখ বন্ধ করে হাঁটছিলাম।
.
চোখ খুললাম মেঘলার ডাকে,ও আমার হাতে ছাতাটা দিয়ে বলল,
-নিন, রিকশা ঠিক করা আছে আমাদের,
-আচ্ছা, কোথায় যাচ্ছেন?
-বন্ধুর বিয়েতে,
-ওহ,,বাই।
.
ছাতা নিয়ে লাভ হয়নি সেদিন।
বাসায় ফিরলাম বৃষ্টিতে ভিজে।
ছাতা হাতে বাসায় ফিরলেও, হৃদয় টা মেঘলার কাছে রেখে এসেছিলাম।সেই হিসেবে লস আমারই।প্রেম ভালো বাসায় লস লাভের হিসেব কষে কোন কাজ হয়না।প্রেম ভালবাসা তো আর ব্যাবসা নয়।
.
পরের দিন বিকেলে আবার ছাতা নিয়ে চললাম। আজ কিছু একটা করতে হবে?
রাতে ঘুমাতে পারিনি,, নীল চোখ গুলো বেশ সর্বনাশ করে দিয়েছে আমার।
.
এবারে কলিংবেল একবার বাজাতেই গেট খুলে গেল,গেট খুললেন একজন বয়স্ক মহিলা। সম্ভবত মেঘলার মা।আমার হাতে ছাতা দেখেই উনি আমার মায়ের কথা জিজ্ঞেস করলেন।
মায়ের সাথে উনি পরিচিত সেটাই বললেন। আমার ওসব শোনার কোন আগ্রহ ছিল না। আমার চোখ জোড়া মেঘলা কে খুঁজছিল।
আমি গত কাল এসেছিলাম এটা বলতেই উনি ভিতরে ঢুকতে বললেন।একটু অভদ্রতা হলেও, উনি একবার বলাতেই বাসায় ঢুকে গেলাম।
.
ভেতরে ঢুকে জিজ্ঞেস করলাম মেঘলার কথা।
উনি বললেন, মেঘলা কলেজে।
আমি ছাতা ফেরত দিয়ে হতাশ হয়ে বাসা থেকে বের হলাম।
.
তবে আমার জন্য ভাল কিছু অপেক্ষা করছিল, বাসা থেকে বের হয়ে কিছুদূর এসে দেখি মেঘলা। কলেজ থেকে ফিরছে।
দুজনের চোখাচুখি হতেই ও এগিয়ে এলো। আমি কিছু বলার আগেই ও বলল,
-ছাতা ফেরত দিয়েছেন?
-জ্বী,
-কালকের জন্য সর‍্যি,
-কেন?
-আপনাকে বসতে বলিনি,
-নাহ ব্যাপার না,
-আন্টির সাথে আমার খুব ভাল সমর্পক,
-হ্যাঁ, আম্মু বলেছিল,
-কি বলেছিল?
-হ্যাঁ, বলেছিল যে,
-কি?
.
আম্মু তো কিছুই বলেনি।
আমি একটু ভেবে বললাম,
-আম্মু আপনার ফোন নাম্বার টা চেয়েছিল,কি জানি কথা বলবে।
-ও আচ্ছা, নিন।
.
মেঘলা এত সহজে ওর নাম্বার দিবে ভাবিনি।
আমি চলে আসার আগে ও আবার বলল,
-আমার নাম নীলাও বুঝছেন,
-তাই নাকি?
-হুম,, কিন্তু সব নীল হলে কেমন? তাই কিছু মেঘলাও হোক।
-বেশ ভাল।
.
ওই রাত্রেই মেঘলাকে ফোন দিলাম।ফোন দেওয়ার কারণ হিসেবে বললাম,মা ওকে আমাদের বাসায় আসতে বলেছে।
আরও অনেক কথাই হলো। মেয়েটা বেশ মিশুক,তাই তো প্রথম দিনেই আপনি থেকে তুমিতে।
.
আমাদের রোজ কথা হত।কোন না কোন বাহানা আমিই বানিয়ে নিতাম।মাঝে মাঝে মেঘলার সাথে দেখাও হত, ওর কলেজেও যেতাম। এগুলোতেও বাহানা করতে হত। অনেক ক্রিয়েটিভ ছিলাম এসবে। তাই সমস্যায় পরতে হয়নি কখনো।
.
মেঘলাও একদিন আমাদের বাসায় এলো, রোজ রোজ আমি যাই।ও নিজেও আসুক মাঝে মাঝে। মা তখনো জানেনা আমার সাথে মেঘলার এত কথা হয়।
.
কয়েক দিন বাদে সিদ্ধান্ত নিলাম মেঘলাকে আমার মনের কথা জানিয়ে দিবো।
তাতে কি হবে দেখা যাবে?
এর জন্য একটা শাড়িও কিনে ফেললাম, নীল রঙের শাড়ি। শাড়ি টা চয়েস করতে একটু কষ্টই হয়েছে। আমার মন বলছিল, নীল শাড়ি দেখে হয়ত মেঘলার মনে আমার জন্য একটু খানি ভালবাসা তৈরী হতেও পারে।
.
শাড়ি কিনে এনে বাসায় লুকিয়ে রাখলাম।
মা দেখলে আবার কি না কি ভাববে?
তবে এত কিছু করেও রক্ষা হলোনা।
মা কিভাবে যেন শাড়ি খুঁজে পেলেন। উনি নীল শাড়ি দেখে অবাক হলেন।আমি নীল পছন্দ করিনা এটা উনি ভালভাবেই জানেন।
.
আমাকে শাড়ির ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতেই আমি বলে দিলাম,
-এটা আমার ফ্রেন্ডের,, ও কিনে আমার কাছে রাখছে।
.
মায়ের মনে একটু দ্বিধা থাকলেও,মা বিশ্বাস করলো। নীল রঙ এতে কাজে দিয়েছে, আমি শাড়ি কিনলেও নীল কিনব না এটা উনি ভালভাবেই জানতেন।
.
মেঘলা কে যখন জানালাম আমি ওকে ভালবাসি ও তখন কিছুক্ষন ভেবে বলল,
-আমি কিছুদিন ভাবি,
-কত দিন?
-কিছুদিন,
-তবুও,
-ত্রিশ দিন,
-এটা কিছু,
-হু,
-আচ্ছা।
.
মেঘলা যাওয়ার সময় শাড়িটাও নিয়ে গেল। শাড়ি টা নেওয়ার সময় বলল,
-শাড়ি নিচ্ছি বলে ভেবোনা আমি রাজী। নীল আমার পছন্দ তাই।
-আচ্ছা, ঠিকাছে।
.
এর পরেও মেঘলার সাথে অল্প অল্প কথা হত। আমি ত্রিশ দিনে শেষ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলাম অধীর আগ্রহে।
তবে কয়েক দিন যাওয়ার পরেই একদিন হুট করে মা বলল,
-তোর বিয়ে দিবো?
-মানে?
-চাকুরী করিস এবার বিয়ে কর,
-না,
.
বাবা আমাকে বলল,
-বিয়ে না করো, মেয়ে দেখো। তাতে কি সমস্যা,
-আচ্ছা,,
.
তবে সারপ্রাইজ হলাম যখন আমাদের কার খানা মেঘলাদের বাসার সামনে উপস্থিত হলো।
আমি মায়ের দিকে তাকিয়ে বললাম,
-মেঘলা?
-হ্যাঁ, মেঘলা।
-কিভাবে?
-পরে,,
.
মা কিভাবে জানলো,কিছুই মাথায় এলোনা।
আমি কখনো মেঘলার ব্যাপারে কাওকে কিছু বলিনি। বসার ঘরে মেঘলাও আমাকে দেখে চমকে উঠল।ও নিজেও ভাবেনি,ছেলে আমি।
ও নিজেও জানতনা,আমার মতই।
.
আসল বোমাটা মা মেঘলা দের বাসার ড্রইং রুমে বসে ফাটালো। মা মেঘলার জন্য কেনা শাড়িটা আমার কাছে দেখেছে এটা জানতাম। তবে উনি যে ওই শাড়িটা মেঘলার কাছেও দেখেছিলেন সেটা জানতাম না।তবে যা হয়েছে ভালই।
তবে আরো ভাল হত যদি মেঘলাও হ্যাঁ বলত।
.
বাসায় ফিরে আমি মেঘলার ফোনের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম।সকালে ও ফোন দিয়েছিল ধরতে পারিনি।মেঘলার ফোন এলো রাতে। ফোন ধরতেই ও বলল,
-সকালে ফোন দিয়েছিলাম,
-হুম,
-তোমাকে উত্তর বলার জন্য সকালে ফোন দিয়েছিলাম, কিন্তু তুমি ফোন ধরোনি,
-কল ব্যাক করেছিলাম।
-যখন করছ, তখন শুনি আজ ছেলে দেখতে আসবে।খুব ঘাবড়ে গেছিলাম,ফোন হাতে নেওয়ার কথা মনে ছিল্ না,
-এখন কেমন লাগছে?
-তোমার?
-আমার বেশ ভাল,তুমি ইচ্ছা করলে আরো ভাল লাগাতে পারো,
-কিভাবে?
-ভালবাসি বলে,
-আচ্ছা, আমিও তোমাকে ভালবাসি।
-সত্যি, সকালে এটা বলার জন্যই ফোন দিয়েছিলা?
-হ্যা,বাবা।সত্যি। তোমার জন্য একটা শার্ট ও কিনেছি,
-তাই?
-জ্বী,
-আচ্ছা, কাল দেখা হচ্ছে,
-হুম,
.
পরের দিন বেশ খুশি মনে মেঘলার সাথে দেখা করতে গেলাম।ও আমাকে দেখেই বলল,
-তোমার জন্য আনা শার্ট টা পড়ে দেখো,
-হুম,কোথায়?
-এইযে,,
.
মেঘলা প্যাকেট থেকে শার্ট টা বের করে আমার সামনে ধরলো, তাতে আমার হাসি হাসি মুখ টা কালো হয়ে গেল।
নীল শার্ট?
নীল শার্ট কেউ পড়ে?
কি চয়েস এই মেয়ের।অবশ্য এই মেয়ের চয়েস আমিই।
.
সব গুলো কথা অবশ্য মনে মনেই বললাম।
সামনা সামনি বললে যে বিয়ে ভেঙে যাবে এটা জানি।
-কেমন হয়েছে?
-খুব ভাল,
-এখনি পড়ো,
-এখানে?
-হ্যাঁ,
-আচ্ছা,
.
আমি নিশ্চিত শার্ট খানা পরে নিজেকে জোকারের মত লাগছিল।কিন্তু মেঘলা বলল খুব ভাল লাগছে।।
শার্ট টা আর খুললাম না, এভাবেই বাসায় গেলাম।মা দেখে মুখ টিপে হাসলো।উনি বুঝে গেছেন কি হয়েছে আমার সাথে।
তবে আমার খুব খারাপ লাগছিল না, নীল রঙ টাতে ভালবাসা ছিল। অনেক ভালবাসা।
.
বিরক্তিকর নীল টা আমার এভাবে প্রিয় হবে ভাবিনি। মেঘলার জন্য কেনা বিয়ের শাড়িটাও নীল। আর আমার বিয়ের পাঞ্জাবীটাও।
দুটাই অবশ্য মেঘলার চয়েসে।
.
আর এখন মেঘলার ছাতাটায় এখন মেঘলা প্লাস আমার নাম ও শোভা পায়। এখন বৃষ্টিতে এক ছাতার নিচে হাঁটার সময় গায়ে গা লেগে গেলেও সমস্যা হয়না।বরংচ ভাল লাগে।
তবে এখনো মেঘলা জানেনা,, ওকে ছাড়া সব নীল আমার বাজে লাগে। শুনলে কি করবে কে জানে??
বিয়ে ভাঙবে? হয়ত না।
নীলের চাইতে আমাকে ও বেশি ভালবাসে।
.
.
-এই টাইপ আরো একটা গল্প আছে সেটার লিংক ফাস্ট কমেন্টে।।
.
-নাহিদ পারভেজ নয়ন

Download Best WordPress Themes Free Download
Download WordPress Themes
Download Best WordPress Themes Free Download
Download WordPress Themes Free
lynda course free download
download lenevo firmware
Premium WordPress Themes Download
udemy course download free
Share:

Leave a Reply

All rights reserved by Kid Max.